বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-১, ২ ও ৩ সার্কেল এখন অনিয়ম আর দুর্নীতির নিরাপদ দুর্গে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়াকে পুঁজি করে চলছে কয়েকশ কোটি টাকার ‘নম্বর বাণিজ্য’। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী দালাল নান্টু শেখ এবং বিআরটিএর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার শক্তিশালী চক্র। সাধারণ মালিকদের জিম্মি করে এই চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী, ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপ বা ধ্বংস করে সেই নম্বরের বিপরীতে নতুন গাড়ি নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আইনি প্রক্রিয়াটিই এখন বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার। বিআরটিএর মিরপুর ও উত্তরা সার্কেলের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নান্টু শেখ প্রতিটি ফাইল ছাড়াতে সরকারি ফি-র বাইরেও ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করছেন। যারা এই অনৈতিক চুক্তিতে রাজি হচ্ছেন না, তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে ‘টেকনিক্যাল’ অজুহাতে।
অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—কাগজে-কলমে গাড়ি ধ্বংস দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক পুরোনো গাড়ি স্ক্র্যাপ না করেই ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে নতুন রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ গাড়িগুলোই নতুন রূপে সড়কে ফিরে আসছে। এতে একদিকে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির চিত্র। ২০১৮ মডেলের একটি টিভিএস থ্রি-হুইলার (যার মেয়াদ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত) ব্যবহার করে ঢাকা মেট্রো-ত-১৬-৩৩৭৫, ১৬-০০৩, ১৪-১৯৭৮ সহ একাধিক গাড়ির স্ক্র্যাপ ও প্রতিস্থাপনের আবেদন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এসব আবেদন করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বড় ধরনের জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়।
বিআরটিএ থেকে স্ক্র্যাপকরণের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি আসার আগেই নান্টু সিন্ডিকেট মাঠ পর্যায়ে মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। মালিকদের ভয় দেখিয়ে কম দামে গাড়ি কিনে নিয়ে নিজেদের গ্যারেজে মজুত করে তারা। পল্লবী ও কালশি এলাকার ভুক্তভোগী মালিকদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে না গেলে ‘ডবল মালিকানা’ বা কাগজের ত্রুটির অজুহাতে হয়রানি করা হয়। একজন মালিক জানান, ৫ লাখ টাকা চুক্তিতে রাজি হলেই সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান মিলে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে প্রায় ২০ হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে অনেক গাড়ি জেলা পর্যায়ের (যেমন গাজীপুর-দ), যা মহানগরে চলাচলের অনুমতি নেই। ‘জরুরি আমদানি-রপ্তানি’ বা ‘সংবাদপত্রের কাজে ব্যবহৃত’ স্টিকার লাগিয়ে এসব গাড়ি চলছে। অভিযোগ রয়েছে, নান্টু শেখের সিন্ডিকেট এসব গাড়ি থেকে নিয়মিত মাসিক মাসোয়ারা আদায় করে।
মাদারীপুর থেকে আসা নান্টু শেখ গত দুই দশকে বিআরটিএকে কেন্দ্র করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এক সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে চললেও বর্তমানে তিনি খোলস পাল্টে বিভিন্ন দলের পরিচয় দিয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখছেন। বর্তমানে রাজধানীর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাসকারী নান্টুর মাসিক আয় কয়েক কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালদের অবাধ বিচরণ এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা সাধারণ মালিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সিন্ডিকেট না ভাঙলে বিআরটিএর সেবায় স্বচ্ছতা ফেরানো সম্ভব নয়। কোটি টাকার এই নম্বর বাণিজ্যের ভাগ ওপরের মহল পর্যন্ত পৌঁছায় কি না, এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত নান্টু শেখের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Leave a Reply